
ঢাকা, ২৮ নভেম্বর ২০২৫ – একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং (Quantum Computing)-এর হাত ধরে বৈশ্বিক শিল্প জগতে নিজেদের অবস্থান দৃঢ় করছে বাংলাদেশ। দেশের শীর্ষস্থানীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান সোনিসিয়াম কোয়ান্টাম ল্যাব (Sonicium Quantum Lab) সম্প্রতি তাদের যুগান্তকারী আবিষ্কার EAF Q-Max কোয়ান্টাম এআই মডেলটি উন্মোচন করেছে। ইলেকট্রিক আর্ক ফার্নেস (EAF)-এর জন্য বিশেষভাবে ডিজাইন করা এই কোয়ান্টাম মেশিন লার্নিং (QML) অ্যালগরিদমটি ইস্পাত উৎপাদন প্রক্রিয়ার অপটিমাইজেশন বা সর্বোচ্চ কার্যকারিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে।
এই মডেলটির চূড়ান্ত নির্ভুলতা (Final Accuracy) দাঁড়িয়েছে ৯২.২৬%, যা প্রচলিত ক্লাসিক্যাল মেশিন লার্নিং মডেলগুলোর (সাধারণত যা ৮৫% থেকে ৮৮% নির্ভুলতা অর্জন করে) চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। এই প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতা কেবল একটি গবেষণালব্ধ সাফল্য নয়, বরং এটি বিশ্বজুড়ে বহু-বিলিয়ন ডলারের ইস্পাত শিল্পে সরাসরি বাণিজ্যিক প্রয়োগের জন্য প্রস্তুত, যার প্রাথমিক লক্ষ্যবস্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বৃহৎ শিল্প বাজার।
প্রযুক্তির গভীরে: QAOA এবং কোয়ান্টাম সুবিধা
EAF Q-Max এআই মডেলের মূলে রয়েছে কোয়ান্টাম অ্যাপ্রক্সিমেট অপটিমাইজেশন অ্যালগরিদম (QAOA)। এটি এমন এক প্রকার হাইব্রিড কোয়ান্টাম-ক্লাসিক্যাল অ্যালগরিদম, যা কঠিন অপটিমাইজেশন সমস্যা সমাধানে কোয়ান্টাম কম্পিউটারের অনন্য ক্ষমতা ব্যবহার করে। ইস্পাত কারখানার ডেটা বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে, যেখানে একই সাথে তাপমাত্রা, বিদ্যুৎ প্রবাহ, কাঁচামালের রচনা এবং সময়-এর মতো ৩৯টি ভিন্ন ভিন্ন চলক (Features) বিবেচনা করতে হয়—এই বিশাল মাত্রার তথ্য প্রক্রিয়াকরণ প্রচলিত কম্পিউটারগুলোর জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।
EAF Q-Max এই জটিলতাকে মোকাবিলা করেছে ৩৯টি কিউবিট (Qubits) এবং ১০টি সার্কিট ডেপথ (Circuit Depth) ব্যবহার করে। কোয়ান্টাম সার্কিটে কিউবিটগুলোর সুপারপজিশন (Superposition) এবং এনট্যাঙ্গেলমেন্ট (Entanglement) ধর্ম ব্যবহার করে, এটি খুব দ্রুত অসংখ্য সম্ভাব্য সমাধানকে সমান্তরালভাবে যাচাই করতে পারে। প্রচলিত মডেলগুলো যেখানে একটির পর একটি সমাধান পরীক্ষা করে, সেখানে কোয়ান্টাম মডেল একই সঙ্গে সমস্ত সম্ভাবনার একটি সম্ভাব্য ক্ষেত্র (Probability Space) তৈরি করে, যা অত্যন্ত দ্রুততম এবং সবচেয়ে নির্ভুল অপটিমাল সমাধান খুঁজে বের করতে সাহায্য করে। এই কারণেই মডেলটি প্রচলিত মডেলগুলোর চেয়ে ৪-৭% বেশি নির্ভুলতা অর্জনে সক্ষম হয়েছে, যা শিল্পক্ষেত্রে একটি বিশাল ‘কোয়ান্টাম অ্যাডভান্টেজ’ (Quantum Advantage) হিসেবে বিবেচিত।
ইস্পাত শিল্পে বৈপ্লবিক পরিবর্তন
ইস্পাত উৎপাদন প্রক্রিয়া, বিশেষ করে EAF-এ, প্রতি মিনিটের অপারেশনাল সিদ্ধান্তের জন্য লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ হয়। EAF-এর কর্মদক্ষতা সাধারণত ‘ট্যাপ-টু-ট্যাপ টাইম’ (Tap-to-Tap Time)-এর ওপর নির্ভর করে, যা এক ব্যাচ গলানো শুরু থেকে পরবর্তী ব্যাচের জন্য প্রস্তুত হওয়া পর্যন্ত সময়কে নির্দেশ করে। EAF Q-Max এআই মডেলের প্রধান লক্ষ্য হল এই সময়কে ন্যূনতম করা এবং একই সাথে বিদ্যুৎ ও কাঁচামাল (যেমন গ্রাফাইট ইলেক্ট্রোড, লাইম) ব্যবহারকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে দক্ষতার সাথে অপটিমাইজ করা।
সোনিসিয়াম ল্যাব নিশ্চিত করেছে যে তাদের মডেলটি EAF প্রক্রিয়া থেকে আসা তাপমাত্রার ডেটা, রাসায়নিক বিশ্লেষণ, এবং শক্তি খরচের (Power Profile) মতো ৩৯টি ডেটা পয়েন্টকে কার্যকরভাবে বিশ্লেষণ করে ফার্নেস অপারেটরদের জন্য একটি পূর্বাভাসমূলক ও প্রেসক্রিপটিভ গাইডেন্স দিতে সক্ষম। এটি এমন ভবিষ্যদ্বাণী করে:
১. বিদ্যুৎ খরচ অপটিমাইজেশন: ঠিক কতটুকু বিদ্যুৎ কখন দিতে হবে, যাতে গলানোর প্রক্রিয়া দ্রুত হয় কিন্তু অতিরিক্ত শক্তি নষ্ট না হয়।
২. কাঁচামাল নিয়ন্ত্রণ: কখন চুনাপাথর (Lime) বা অন্যান্য মিশ্রণ যোগ করতে হবে যাতে গলিত ধাতুর রাসায়নিক গুণাগুণ নিখুঁত থাকে।
৩. আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম: ফার্নেসের কোনো অংশের ব্যর্থতার পূর্বাভাস বা গুণাগুণের ত্রুটি দ্রুত চিহ্নিত করা।
এই অপটিমাইজেশনের ফলস্বরূপ, একটি বৃহৎ ইস্পাত কারখানায় প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার শক্তি সাশ্রয় সম্ভব। EAF Q-Max মডেলটি কেবল ইস্পাতকে সাশ্রয়ী মূল্যে পরিবেশন করবে না, বরং বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণ কমাতেও পরোক্ষভাবে সহায়তা করবে।
মডেল প্রশিক্ষণ এবং কারিগরি শক্তি
EAF Q-Max এআই মডেলটির প্রশিক্ষণ এবং যাচাইকরণ প্রক্রিয়া অত্যন্ত কঠোর মানদণ্ড মেনে সম্পন্ন হয়েছে। মডেলটিকে ১০০টি ইপক (Epochs) ধরে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। ট্রেনিং লগ অনুসারে, প্রথম দিকের ইপকগুলোতে যেখানে অ্যাকুরেসি ছিল মাত্র ২৪.২৩%, সেখানে ১০০তম ইপক শেষে সেই অ্যাকুরেসি ৯২.২৬%-এ পৌঁছেছে, যা মডেলটির শক্তিশালী কনভারজেন্স (Convergence) ক্ষমতা প্রমাণ করে। এর চূড়ান্ত লস (Final Loss) ছিল মাত্র ০.১৪৫৫৫৭।
কোয়ান্টাম সার্কিটটি Qiskit প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে ডিজাইন করা হয়েছে এবং IBM Quantum Simulator ব্যাকএন্ডে এর কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হয়েছে। সার্কিটে হ্যাডামার্ড (H), RY, CNOT, এবং RZ-এর মতো মৌলিক গেটগুলি ব্যবহার করা হয়েছে। এই গভীর এবং বিস্তৃত প্রশিক্ষণ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করে যে, মডেলটি বাস্তব শিল্প ডেটার জটিলতা বুঝতে এবং কার্যকর সমাধান দিতে সম্পূর্ণরূপে প্রস্তুত।
বাণিজ্যিক কৌশল: Q-APIaaS মডেল
EAF Q-Max এর বাণিজ্যিকীকরণের জন্য সোনিসিয়াম ল্যাব একটি উদ্ভাবনী মডেল গ্রহণ করেছে, যার নাম Q-APIaaS (Quantum-as-a-Service)। এটি ক্লায়েন্টদের জন্য কোয়ান্টাম প্রযুক্তি ব্যবহারের জটিলতা দূর করে এবং ঝুঁকি কমিয়ে দেয়।
Q-APIaaS মডেলের মূল বৈশিষ্ট্যগুলি হলো:
১. হাইব্রিড ডিপ্লয়মেন্ট: ক্লায়েন্টের ইস্পাত কারখানায় কেবল ক্লাসিক্যাল ডেটা প্রি-প্রসেসিং ইউনিট এবং একটি সহজ API ইন্টারফেস ইনস্টল করা হবে। জটিল কোয়ান্টাম অপটিমাইজেশন অ্যালগরিদমটি সোনিসিয়াম কোয়ান্টাম ল্যাবের ক্লাউড সার্ভারে চালানো হবে। ফলে ক্লায়েন্টকে ব্যয়বহুল কোয়ান্টাম হার্ডওয়্যার কিনতে হবে না।
২. আউটকাম-ভিত্তিক মূল্য নির্ধারণ (Outcome-Based Pricing): এটি সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক। প্রথাগত লাইসেন্সিং ফি-এর পরিবর্তে, ক্লায়েন্টরা শুধুমাত্র তখনই অর্থ প্রদান করবে যখন তারা EAF Q-Max ব্যবহারের মাধ্যমে বাস্তব ফলাফল (যেমন ‘ট্যাপ-টু-ট্যাপ টাইম’ কমা বা শক্তি সাশ্রয়) অর্জন করবে। এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো শিল্প বাজারে নতুন প্রযুক্তির গ্রহণযোগ্যতা দ্রুত বাড়াতে সহায়ক হবে।
৩. পোস্ট-কোয়ান্টাম ক্রিপ্টোগ্রাফি (PQC) নিরাপত্তা: সংবেদনশীল শিল্প ডেটা সুরক্ষার জন্য, মডেলের পুরো ক্লাউড অবকাঠামোতে PQC বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এই নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করে যে ভবিষ্যতের শক্তিশালী কোয়ান্টাম কম্পিউটার দ্বারাও যেন ক্লায়েন্টের ডেটা হ্যাক না হতে পারে, যা বিশেষত সংবেদনশীল মার্কিন শিল্প ডেটার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্মতি (Compliance) ফ্যাক্টর।
অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব
EAF Q-Max এর বাণিজ্যিক সাফল্য বাংলাদেশের জন্য বিশাল অর্থনৈতিক এবং কৌশলগত সম্ভাবনা উন্মুক্ত করেছে।
অর্থনৈতিক রোডম্যাপ:
প্রাথমিকভাবে, এই প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ ছিল প্রায় ১১ লক্ষ টাকা (বাংলাদেশি টাকা)। এই বিনিয়োগ গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D), ক্লাউড অবকাঠামো এবং প্রাথমিক বিপণনে ব্যয় করা হয়েছে। কিন্তু, শুধুমাত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি বৃহৎ ইস্পাত কারখানায় সফলভাবে Q-APIaaS মডেল প্রয়োগের মাধ্যমে প্রথম বছরেই প্রায় ১.২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ১৪ কোটি টাকা) রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এই বিশাল রাজস্বের প্রত্যাশা স্পষ্ট করে যে, উচ্চ-প্রযুক্তির কোয়ান্টাম পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে বাংলাদেশ কেবল শ্রম-ভিত্তিক অর্থনীতি থেকে জ্ঞান-ভিত্তিক অর্থনীতিতে উত্তরণের একটি শক্তিশালী ভিত্তি স্থাপন করছে।
কৌশলগত ও কূটনৈতিক প্রভাব:
EAF Q-Max এর সাফল্য আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে:
প্রযুক্তিগত নেতৃত্ব: উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ যে বৈশ্বিক কোয়ান্টাম প্রযুক্তি প্রতিযোগিতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়, এটি সেই বার্তা দেয়। ইস্পাত একটি মৌলিক শিল্প, এবং এই শিল্পে অপটিমাইজেশন প্রযুক্তি সরবরাহ করা কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মার্কিন অংশীদারিত্ব: মডেলটির প্রাথমিক লক্ষ্য যেহেতু মার্কিন শিল্প বাজার, তাই এটি বৃহত্তর মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানি এবং শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে কৌশলগত অংশীদারিত্বের সুযোগ তৈরি করবে। এটি বাংলাদেশের প্রযুক্তি-কূটনীতিকে আরও শক্তিশালী করবে।
ডেটা সার্বভৌমত্ব: দেশীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত ক্লাউড প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে শিল্প ডেটা বিশ্লেষণ করা হয়, যা ক্লায়েন্টদের জন্য উন্নত ডেটা সার্বভৌমত্বের নিশ্চয়তা দেয়, যা আজকের ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং চ্যালেঞ্জ
সোনিসিয়াম কোয়ান্টাম ল্যাব শুধুমাত্র ইস্পাত শিল্পে থেমে থাকতে চায় না। EAF Q-Max এর সফল ডিপ্লয়মেন্টের পর, তারা একই QAOA এবং QML কৌশল ব্যবহার করে তেল ও গ্যাস উত্তোলন, বিদ্যুৎ গ্রিড অপটিমাইজেশন এবং লজিস্টিকস-এর মতো অন্যান্য জটিল শিল্পে প্রবেশ করার পরিকল্পনা করছে।
তবে, চ্যালেঞ্জও রয়েছে। সিমুলেটর থেকে প্রকৃত NISQ (Noisy Intermediate-Scale Quantum) হার্ডওয়্যারে মডেল স্থানান্তর করা এবং হার্ডওয়্যারের নয়েজ (Noise) সত্ত্বেও ৯২.২৬% নির্ভুলতা বজায় রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ল্যাব কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা নয়েজ প্রশমন কৌশল এবং ত্রুটি-সহনশীলতা (Fault-Tolerance) প্রযুক্তিতে আরও বিনিয়োগ করে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে প্রস্তুত।
মোটকথা, EAF Q-Max শুধুমাত্র একটি সফটওয়্যার মডেল নয়; এটি বাংলাদেশের প্রযুক্তিগত উত্থানের প্রতীক। এই সাফল্য প্রমাণ করে যে সঠিক গবেষণা ও বাণিজ্যিক কৌশল অবলম্বন করলে, একটি উন্নয়নশীল দেশও বৈশ্বিক উচ্চ-প্রযুক্তি খাতে নেতৃত্ব দিতে পারে এবং একই সাথে নিজেদের জাতীয় অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে পারে।