গুম হওয়া পরিবারের স্বজনরা এখনও তাদের প্রিয়জনদের ফিরে আসার অপেক্ষায় দিন গুণছেন। তারা বলছেন, শেখ হাসিনা সরকারের পতন হলেও এই মানুষগুলোর কেন খোঁজ মিলছে না ? আন্তর্জাতিক গুম হয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের স্মরণে আন্তর্জাতিক দিবসে অধিকার’র আয়োজনে রাজশাহী মহানগরীর সাহেব বাজার জিরো পয়েন্টে মানববন্ধনে হারিয়ে যাওয়া স্বজনদের সন্ধান দিতে এবং গুমের সাথে জড়িতদের অবিলম্বে আইনের আওতায় এনে ভোটের আগেই বিচারের কার্য শেষ করার দাবি করেছেন তারা।
শেখ হাসিনা সরকারের রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় নিখোঁজ এদেরই কারও বাবা, কারও সন্তান, কারও স্বামী, কারও ভাই। বছরের পর বছর গুম হওয়া স্বজনের অপেক্ষায় পরিবারের সদস্যরা। তাদের আর্তনাদ-আহাজারিতে ভারি হয়ে ওঠে সাহেব বাজার জিরোপয়েন্ট। নিখোঁজদের ফেরত পাওয়ার আকুতি তাদের। র্যালি ও মানববন্ধনে উপস্থিত হন গুম হওয়া ৫টি পরিবারের সদস্যরা। সঙ্গে ছিলো গুম হওয়া স্বজনের ছবি নিয়ে ফিরে পাওয়ার আকুতি। এসময় গুম থেকে ফিরে আসা ৭ ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন।
গুম হয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের স্বরণে আন্তর্জাতিক দিবস উপলক্ষে মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’র উদ্যোগে শনিবার (৩০ আগস্ট) সকাল সাড়ে ১১টায় রাজশহী মহানগরীর আলুপট্রি থেকে একটি র্যালি বের হয়। র্যালিটি নগরীর গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সড়ক প্রদিক্ষণ করে সাহেব বাজার জিরো পয়েন্টে মানববন্ধে মিলিত হয়।
গুমের ঘটনা থেকে কেউ কেউ বেঁচে ফিরছেন। তাদের মধ্যে আতিকুল ইসলাম প্রশ্ন রেখে বলেন, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা দেয়ার কথা প্রতিটি নাগরিককে, কিন্তু সরকারি বাহিনী কোন আইনি বলে তাদের গুম করেছিল ? তিনি বলেন, ‘আমার পরিবারের মত অসংখ্য পরিবারের এই কষ্ট মাসের পর মাস বছরের পর বছর যেন বয়ে যেতে না হয়। গুমের ঘটনায় জড়িতদের অবশ্যই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। ’ গুম হওয়া ব্যক্তিদের ফেরত পাওয়ার পাশাপাশি আয়নাঘর নামক নির্যাতন কারখানা বিলুপ্ত ঘোষণারও দাবি জানিয়েছেন তিনি। মানববন্ধনে গুম হওয়া পরিবারের সদস্যরা অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে দাবি জানিয়ে বলেন, আমাদের পিতা বা স্বামী জীবিত না মৃত, আমরা পিতৃহারা, বিধবা না সধবা এর নিশ্চয়তা চাই। আমরা চাই গুমের সাথে জড়িতদের অবিলম্বে আইনের আওতায় এনে ভোটের আগেই বিচারের কার্য শেষ করতে হবে।
‘অধিকার’র রাজশাহীর সমন্বয়ক ও দৈনিক আমার দেশ’র ব্যুরো প্রধান মঈন উদ্দিন’র পরিচালনায় মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে রেজিষ্ট্রার মানবাধিকার কর্মী ড. ইফতেখারুল আলম মাসউদ, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সহকারী মহাসচিব ও আরইউজে’র সাধারণ সম্পাদক ড. সাদিকুল ইসলাম স্বপন, দীর্ঘ ছয় মাস গুম থেকে ফিরে আসা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রনেতা আতিকুল ইসলাম, গুম হওয়া ব্যাক্তি আব্দুল কুদ্দুসের স্ত্রী জামিলা আক্তার, গুম হওয়া ব্যাক্তি মুরশিদুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা বিবি, গ্রীন ভয়েজ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য আহসান হাবীব, স্টুডেন্ট অ্যাক্টিভিস্ট মাহমুদুল হাসান ও আরিফুল ইসলাম। পরে মানবাধিকার সংগঠন অধিকার’র বিবৃতি পাঠ করে শুনান দীর্ঘ ছয় মাস পর গুম থেকে ফিরে আসা ব্যাক্তি আলামিন হোসেন।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন, গুম থেকে ফিরে আসা মিজান ইসলাম, আল-আমিন, মাসুদ রানা, মিজান, বুলবুল ইসলাম, মো. সুমন। এছাড়া উপস্থিত ছিলেন, রাজশাহী রিপোর্টার্স ইউনিটির সহ সভাপতি ও মানবাধিকার কর্মী মাসুদ রানা রাব্বানী, মানবাধিকার কর্মী ও সাংবাদিক কাজি নুরুল আলম, মানবাধিকার কর্মী আনোয়ার হোসেন ফিরোজ, মানবাধিকার কর্মী এম শামিম আক্তারসহ শতাধিক সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী। প্রতিকূল আবহাওয়ায় তপ্ত রোদে রাজশাহী মহানগরীর প্রাণ কেন্দ্রে শতাধিক সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী মানববন্ধনে উপস্থিত ছিলেন।
মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’র রাজশাহীর সমন্বয়ক ও দৈনিক আমার দেশ’র ব্যুরো প্রধান মঈন উদ্দিন অধিকার’র পক্ষ থেকে অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে ১০ টি দাবি তুলে ধরেন- ১। সব গুমের ঘটনায় স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত পরিচালনা করতে হবে; ২। গুম অবস্থা থেকে ফেরত না আসা ব্যক্তিদের অনুসন্ধানের জন্য নীতিমালা প্রণয়ণ করে একটি জাতীয় কৌশল গ্রহণ করা ৩। গুম থেকে ফিরে আসা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দায়ের করা সব মিথ্যা বা সাজানো মামলা অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে ৪। গুম অবস্থা থেকে ফেরত না আসা ব্যক্তিদের পরিবার যেন ভুক্তভোগীর ব্যাংক হিসাব, সম্পদ ও সম্পত্তি পরিচালনা করতে পারে সে জন্য নির্দেশনা প্রদান করা এবং ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের জন্য যথাযথ ক্ষতিপূরণের বিধান রাখতে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে ৫। বিচারিক প্রক্রিয়ায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভুক্তভোগী ও সাক্ষী সুরক্ষা আইন প্রণয়ণ করতে হবে ৬। সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯ বাতিল বা সংশোধন করতে হবে ৭। গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার ঘটনায় জড়িত র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) কে বিলুপ্ত করতে হবে ৮। গুমের প্রমান ধ্বংসের সাথে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনতে হবে ৯। ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের দীর্ঘমেয়াদি ভোগান্তি বন্ধে ন্যায্য, স্বচ্ছ ও দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে; এবং ১০। আইসিপিপিইডি বাস্তবায়ন এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মান অনুযায়ী ফরেনসিক, আইনগত ও তদন্তে সক্ষমতা উন্নত করতে বাংলাদেশ সরকারের কারিগরি ব্যবস্থা উন্নত করা।