শীতের কুয়াশা ভেদ করে রাজশাহী ভেসে উঠছে খেজুররসের মায়াবী সুবাসে
অপু দাস, স্টাফ রিপোর্টার, রাজশাহী
রাজশাহীর শীত যেন নিজের মতো করে আসে—নরম কুয়াশা, শিশিরে ভেজা ধানক্ষেত আর ভোররাতের নীরবতা ভেদ করে ভেসে আসে ভাপা পিঠার গন্ধ। আর এই শীতের আসল প্রাণ—খেজুরগাছের টাটকা রস। শীত নামলেই এ অঞ্চলের গ্রামের সকাল জেগে ওঠে রসের মিষ্টি ঘ্রাণ আর গাছিদের কর্মব্যস্ততায়।
পবা, চারঘাট, বাঘা ও গোদাগাড়ীর পথ ধরে এখন প্রতিদিনই দেখা যায় ভোরের এক পরিচিত দৃশ্য। গাছিরা মাফলারে জড়ানো শরীরে খেজুরগাছের মাথায় বেঁধে রাখা ঘড়া নামাতে ব্যস্ত। রসের টুপটাপ পড়ার শব্দে শীত আরও জীবন্ত হয়ে ওঠে।
তবে এবার রস সংগ্রহে সতর্কতা আরও বেড়েছে। গাছিরা ঘড়াগুলো মশারির কাপড়ে ঢেকে রাখছেন, যেন পোকামাকড় বা বাদুড় রসের ক্ষতি করতে না পারে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হলেও অনেকেই এখনো কাঁচা রস খেতে ভয় পান। এ কারণে শহরের রাস্তায় ঘাড়ে ঝুলানো ঘড়া নিয়ে রস বিক্রির যে দৃশ্য একসময় সাধারণ ছিল—আজ তা প্রায় নেই বললেই চলে। তবে গ্রামে এখনো সেই পরিচিত সকালের ছবি অক্ষুণ্ন, যেন সময় সেখানে একটু ধীরে চলে।
চারঘাটের গাছি হাবিবুর রহমান বললেন,
“শীত এলেই নতুন করে কাজ শুরু হয়। রস আমাদের বাড়তি আয়ের বড় ভরসা। আর এর স্বাদ—গ্রামের মানুষের কাছে শীতের প্রথম আনন্দ।”
শহর ও গ্রামের হাটগুলোতে তাই সকাল থেকেই ভিড়। ভাপা পিঠা, পায়েস, চিতই—এসবের সঙ্গে খেজুররস যেন অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাজারে রস আনতেই মুহূর্তে খালি হয়ে যায় কলসি। এক গ্লাস ২০ থেকে ৩০ টাকায় বিক্রি হলেও স্বাদে তা অমূল্য।
এ বছর খেজুরগাছের সংখ্যা কিছুটা কম হলেও রসের মান ভালো থাকায় পাটালি ও লালি গুড় তৈরির ব্যস্ততা তুঙ্গে। রাজশাহীর গুড়ের সুনাম দেশজুড়েই পরিচিত, তাই ক্রেতার অভাব নেই।
হাটে দাঁড়ালে দেখা যায়—একদিকে পিঠার চুলায় উষ্ণ বাষ্প, অন্যদিকে রসভর্তি কলসি নিয়ে মানুষের হাঁটাহাঁটি। রসের মিষ্টি সুবাসে শীত যেন নিজের কবিতা লিখে চলে।
রসপ্রেমীরা বলছেন,
“শীতের সকাল খেজুররস ছাড়া অসম্পূর্ণ। এটি শুধু রস নয়, আমাদের গ্রামীণ সংস্কৃতি আর শৈশবের স্মৃতি।”
রাজশাহীর এই খেজুররস তাই শুধু স্বাদ নয়—অসংখ্য মানুষের জীবিকার উৎস। শীত যত গভীর হচ্ছে, তত জমে উঠছে রস ও গুড়ের বাজার। ব্যবসায়ীদের আশা—আরও কিছুদিনেই বাজারে প্রাণের জোয়ার বাড়বে আরও বেশি।
ঋতুর স্নিগ্ধতা, মাটির গন্ধ আর খেজুররসের মিষ্টি সুবাস মিলিয়ে রাজশাহীর শীত হয়ে উঠেছে এক অনন্য উৎসব—যেখানে স্বাদ, ঐতিহ্য আর জীবনের গল্প সবই একসূত্রে গাঁথা।